<p><br></p>
চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যকার দীর্ঘদিনের লাভজনক বাণিজ্যিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরেছে। পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক এখন রূপ নিয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা ও বাজার দখলের লড়াইয়ে। চীনের অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা, ইউরোপীয় বাজারে চীনা পণ্যের সয়লাব এবং চীনের নিজস্ব বাজারে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর ব্যবসা সংকুচিত হয়ে পড়াই এই অবনতির মূল কারণ।
সম্পর্ক অবনতির নেপথ্যের কারণসমূহ:
'মেড ইন চায়না ২০২৫' কর্মসূচি: বেইজিংয়ের এই উচ্চাভিলাষী নীতির ফলে উৎপাদনশিল্পের আধুনিকায়ন ঘটেছে এবং চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে।
উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি: অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি পণ্য বিক্রির জন্য বিদেশি বাজারের ওপর চীনের নির্ভরতা অনেক বেড়েছে।
ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের মন্দা: একসময় চীনে মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ ও অডির মতো ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলোর ব্যবসা রমরমা থাকলেও, স্থানীয় চীনা প্রতিযোগীদের উত্থানে তা মারাত্মকভাবে হোঁচট খেয়েছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি হিসাব অনুযায়ী, চীনে মার্সিডিজের বিক্রি ৩০%, বিএমডব্লিউর ২৫% এবং অডির বিক্রি ১২% পর্যন্ত কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও বাণিজ্যঘাটতি: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর শুল্কনীতির কারণে চীনা পণ্যের মার্কিন বাজার সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ফলে চীন তাদের পণ্য ইউরোপের বাজারে পাঠানোর প্রবণতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে:
২০২৫ সালে চীন থেকে ইইউর পণ্য আমদানি ১২.৫% বৃদ্ধি পায়।
২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১২ মাসেও আমদানি আরও ৮% বৃদ্ধি পায়।
এর জেরে চীন ও ইইউর বাণিজ্যঘাটতি ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকের ৬৬ বিলিয়ন ইউরো থেকে বেড়ে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১০৩ বিলিয়ন ইউরোতে দাঁড়িয়েছে।
ইউরোপীয় মহলে চরম উদ্বেগ: এই পরিস্থিতি ইউরোপের অর্থনীতিতে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করেছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন লাগার্দ সতর্ক করে বলেছেন, চীনের সঙ্গে এই বাণিজ্য ইউরোপের মধ্যম প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশিল্পের ভিত্তি দুর্বল করে দিতে পারে। ফ্রান্স ও জার্মানির মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর সরকারি প্রতিবেদনেও চীনা আমদানিকে ইউরোপীয় অর্থনীতির জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
নতুন দর-কষাকষির সুযোগ ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ: বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিই ইউরোপের জন্য বেইজিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টির বড় সুযোগ তৈরি করেছে। সম্প্রতি চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন শুল্ক আরোপ করার পর, বেইজিং ইউরোপে প্লাগ-ইন ও হাইব্রিড গাড়ি রফতানি বছরে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫০ হাজারে সীমিত রাখতে সম্মত হয়েছে। পাশাপাশি রাসায়নিক পণ্য আমদানিতেও সীমা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা চলছে এবং চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার কাজ হাতে নিয়েছে ইইউ।
প্যারিসভিত্তিক জ্যাক দেলর ইনস্টিটিউটের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাবিষয়ক পরিচালক এলভির ফ্যাব্রির মতে, ইউরোপের সামনে এই দর-কষাকষির সময়সীমা খুবই সংক্ষিপ্ত, তাই তারা এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে সচেষ্ট রয়েছে।