<p><br></p>
হঠাৎ করেই আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো বদলে গিয়েছিল জীবন। যে পরিবারের একসময় দিনমজুর বা ভ্যান চালিয়ে দিন কাটত, সেই পরিবারের সন্তান রুবেল মিয়া আজ শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড়ের মালিক। অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল প্রতারণা এবং অর্থপাচারের মাধ্যমে দেশজুড়ে গড়ে তোলা এক বিশাল সাম্রাজ্যের মূল হোতা এই রুবেল, যিনি এলাকায় ‘ক্যাসিনো সম্রাট রুবেল’ নামে পরিচিত।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার শরীফপুর গ্রামের মো. রুবেল মিয়া একসময় এলাকায় একটি ছোট্ট চায়ের স্টল চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তিনি জড়িয়ে পড়েন অন্ধকার জগতের সাথে। ডিজিটাল ডিভাইস ও ভুয়া অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা এবং অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণই ছিল তার মূল পেশা।
সম্প্রতি আমেরিকান কোম্পানির প্রলোভন দেখিয়ে ৭৬ লাখ ৩৬ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ঢাকার পল্টন মডেল থানায় একটি প্রতারণার মামলা হয়। ওই মামলায় রুবেলকে অনলাইন জুয়া ও প্রতারণাচক্রের ‘এশিয়া অঞ্চলের কান্ট্রি ডিরেক্টর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগেও ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে তাকে অনলাইন জুয়ার মূল হোতা হিসেবে গ্রেপ্তার করেছিল ডিএমপির সিটি সাইবার ক্রাইম ইউনিট। তবে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
গত ২ অক্টোবর দুবাই পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার সময় সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তাকে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং সবশেষ পল্টন থানার ডিজিটাল প্রতারণা মামলায় হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে ডিএমপির ডিবি দক্ষিণ বিভাগ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৫ বছরে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় রুবেল ও তার পরিবারের নামে শতকোটি টাকার বেশি মূল্যের জমি ও স্থাবর সম্পত্তি কেনা হয়েছে। তার সম্পদের দীর্ঘ তালিকায় রয়েছে:
সুলতানশী ও যমুনাবাদ মৌজায় বিভিন্ন দলিল মূলে বিপুল পরিমাণ জমি (শুধু রুবেলের নামেই রয়েছে ১৫ বিঘা জমি)।
কটিয়াদী বাজারে ১০ শতক জমির ওপর একটি বিলাসবহুল মার্কেট।
শ্রীমঙ্গলে ৪ তলা ও ৩ তলা দুটি বড় ভবন এবং শত বিঘার বেশি জমির ওপর নির্মিত রিসোর্ট।
হবিগঞ্জ ও ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, বাড়ি এবং জমি।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, দুবাইয়ে বিলাসবহুল বাংলো, সুপার শপ, হোটেল এবং ক্যাসিনো ব্যবসার মাধ্যমে তিনি দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক সংসদ সদস্য আবু জাহিরের অর্থ জোগানদাতা হিসেবে কাজ করতেন এই রুবেল। নিজেকে যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি এই অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।
এই প্রতারণা চক্রে রুবেলের সাথে যুক্ত রয়েছে একটি বড় সিন্ডিকেট। মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন—মো. ইকবাল আশরাফ (ক্যাসিনো ইকবাল), তাসনুভা নওরিন সানজানা, জুয়েল রানা, মো. সুজন এবং হবিগঞ্জের ময়নুল হাসান। এর মধ্যে ময়নুল হাসান বিএনপির রাজনীতির সাথে যুক্ত থেকে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটরের পদ বাগিয়ে নিলেও ইতোমধ্যে তার সেই নিয়োগ বাতিল করেছে আইন মন্ত্রণালয়। এছাড়া রুবেলের ভাই সোহাগ মিয়া ওরফে ‘মাদক্কা সোহাগ’ বর্তমানে দুবাইয়ে বসে এই মাদক চোরাচালান ও জুয়ার সাম্রাজ্য পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
হবিগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ জিকে গউছ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, অপরাধী যেই দলেরই হোক না কেন, বর্তমান সরকার তাদের বিন্দুমাত্র ছাড় দেবে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ইতিমধ্যে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।