<p><br></p>
দেশের জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালনকারী সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি (পিজিসিবি)। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবরক্ষণে ব্যবহার করা হয় বিজনেস অপারেশন সিস্টেম সফটওয়্যার (বস)। অভিযোগ উঠেছে, নিরীক্ষা প্রতিবেদন তৈরির আগেই এ সফটওয়্যার থেকে ভাউচার মুছে ফেলা হয়েছে। পরে ম্যানুয়ালি তৈরি করা হয়েছে ভাউচার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অন্তত ২৬০টি ভাউচার ডিলিটের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৯৮টি ছিল ডুপ্লিকেট ভাউচার।
ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষিত লেনদেনের তথ্য মুছে ফেলা এবং পরে এক্সেলে রূপান্তর করা তথ্যের ভিত্তিতে নিরীক্ষা সম্পন্ন করার বিষয়টি আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বড় একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসাব ব্যবস্থায় এমন ঘটনা বিনিয়োগকারীদের জন্যও উদ্বেগের।
অনুসন্ধানে পিজিসিবির হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যারে ভাউচার মুছে ফেলার এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অডিট-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে অন্তত ২৬০টি ভাউচার ডিলিটের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৯৮টি ডুপ্লিকেট ভাউচার। অর্থাৎ, এসব ভাউচার দুবার ইনপুট দেয়া হয়েছিল। পরে সেগুলো মুছে ফেলা হয়। ‘omar’ নামের একটি ইউজার আইডি থেকে সব ভাউচার ডিলিট করা হয়েছে বলে নথিতে দেখা যায়।
নিরীক্ষার সময় বিষয়টি ধরা পড়লেও চূড়ান্ত অডিট প্রতিবেদনে তা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। অথচ আর্থিক নিরীক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের নথি, কেনাকাটার রসিদ, হিসাবের খাতা ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হয়। আধুনিক হিসাব ব্যবস্থায় সফটওয়্যার ব্যবহারের কারণে এর তথ্য সংরক্ষণ, পরিবর্তন ও মুছে ফেলার রেকর্ড বা অডিট ট্রেইল যাচাইও গুরুত্বপূর্ণ।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পিজিসিবির বস সফটওয়্যার থেকে ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই এক দিনেই সর্বোচ্চ ৮৩টি ভাউচার ডিলিট করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ৭৪টি এবং ১৩ এপ্রিল ৭৩টি ভাউচার মুছে ফেলা হয়। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই দুটি, ১১ আগস্ট তিনটি, ১৩ আগস্ট একটি, ১৭ নভেম্বর তিনটি এবং ১৮ নভেম্বর দুটি ভাউচার ডিলিট করা হয়। ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি তিনটি, ২১ জানুয়ারি পাঁচটি, ৮ এপ্রিল পাঁচটি, ১৫ এপ্রিল তিনটি এবং ২১ এপ্রিল তিনটি ভাউচার মুছে ফেলা হয়।
আর্থিক নিরীক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার থেকে ভাউচার মুছে ফেলার ঘটনা অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার বহি:প্রকাশ। এর মাধ্যমে অনিয়ম বা ব্যয় আড়াল করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পিজিসিবির মোট রাজস্ব ছিল ৩ হাজার ৯৯ কোটি ৭৯ লাখ ৩৯ হাজার ৫৯১ টাকা। ওই অর্থবছরে কর-পরবর্তী নিট লোকসান হয়েছে ২১০ কোটি ৬২ লাখ ৪০ হাজার ৮০৭ টাকা। শেয়ারপ্রতি লোকসান (ইপিএস) ছিল ২ টাকা ৩০ পয়সা। আগের অর্থবছরে লোকসান ছিল ৬১০ কোটি ৯০ লাখ টাকা। লোকসানের পরিমাণ কমলেও হাজার কোটি টাকার লেনদেন হওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার থেকে ভাউচার মুছে ফেলার ঘটনা হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সফটওয়্যার থেকে তথ্য মুছে ফেলা ও নিরীক্ষা প্রক্রিয়া নিয়ে পিজিসিবি কর্তৃপক্ষ এবং নিরীক্ষকদের বক্তব্যে বৈপরীত্য পাওয়া গেছে। পিজিসিবির নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) মো. মনিরুজ্জামান আপন দেশকে বলেন, নতুন ইআরপি সফটওয়্যার (মাইক্রোসফট ৩৬৫) এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। তাই পুরোনো বস সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখান থেকে তথ্য এক্সেলে রূপান্তর করে নিরীক্ষকদের দেয়া হয়। তবে সফটওয়্যার থেকে তথ্য মুছে ফেলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাবি করেন, বস সফটওয়্যার থেকে কোনো তথ্য ডিলিট হয় না।
অন্যদিকে, পিজিসিবি কর্মকর্তার এ বক্তব্যের সঙ্গে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের অমিল রয়েছে। ভাউচার মুছে ফেলার বিষয়টি নিরীক্ষার সময় নজরে এসেছে বলে জানিয়েছেন অডিট ফার্ম একনাবীনের পরিচালক মাহমুদুর রহমান।
তিনি বলেন, নিরীক্ষার সময় আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি। আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা মানদণ্ড (আইএসএ) অনুসরণ করে নমুনাভিত্তিকভাবে তা যাচাই করেছি। এতে উল্লেখযোগ্য কোনো আর্থিক প্রভাব পাওয়া যায়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
মাহমুদুর রহমান আরও বলেন, এটি কোম্পানির রিপোর্টিং ব্যবস্থার একটি অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণগত দুর্বলতা। আইএসএ অনুযায়ী ম্যানেজমেন্ট লেটারের মাধ্যমে বিষয়টি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এ ধরনের চর্চার কারণ ব্যাখ্যা করে বক্তব্য দিয়েছে। সে বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নিরীক্ষকরাও নিজেদের মতামত ও পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন। অর্থাৎ, পিজিসিবির নির্বাহী পরিচালক যেখানে সফটওয়্যার থেকে তথ্য ডিলিট হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন, সেখানে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান ভাউচার মুছে ফেলার ঘটনা সম্পর্কে অবগত থাকার কথা স্বীকার করেছে। এ বিষয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনাকে চিঠি দেয়ার কথাও জানিয়েছে তারা।
তবে পিজিসিবির চূড়ান্ত নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে ২৬০টি ভাউচার ডিলিটের ঘটনা বা এ-সংক্রান্ত আইটি নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা নিয়ে সরাসরি কোনো পর্যবেক্ষণ নেই। সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রকাশিত মূল প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখ না করে শুধু অভ্যন্তরীণ ম্যানেজমেন্ট লেটারে সীমাবদ্ধ রাখার কারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পিজিসিবির আগের কয়েক বছরের অডিট প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেও কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষক ছিল মাবস অ্যান্ড জে পার্টনার্স এবং এম জে আবেদীন অ্যান্ড কোং। ২০২২-২৩ অর্থবছরে দায়িত্ব পালন করে হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোং এবং এম জে আবেদীন অ্যান্ড কোং। এরপর ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যৌথ নিরীক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে হুদা ভাসি চৌধুরী অ্যান্ড কোং এবং একনাবীন।
নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, পরপর দুই অর্থবছরের প্রতিবেদনে আইটি অডিট-সংক্রান্ত মন্তব্য হুবহু একই ছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে মূল প্রতিবেদনে আইটি অডিট বিষয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে এম জে আবেদীন অ্যান্ড কোং-এর পার্টনার কামরুল আবেদীন বলেন, আইটি অডিটে নিরীক্ষক যদি একই ধরনের পরিবেশ পান, তাহলে মন্তব্যের মিল থাকা স্বাভাবিক।
সার্বিক বিষয়ে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা ও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক প্রকৌশলী সৈয়দ জাহিদ হোসেন বলেন, আইটি অডিট কোনো স্থির বিষয় নয়। প্রতি বছর সিস্টেম, কনফিগারেশন ও ঝুঁকির পরিবর্তন হয়। এরপরও পরপর দুই অর্থবছরের অডিট মন্তব্য হুবহু এক হওয়া স্বাধীন পরীক্ষা ছাড়াই আগের বছরের প্রতিবেদন কপি-পেস্ট করার সন্দেহ তৈরি করে। এতে নিরীক্ষার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
প্রকৌশলী জাহিদ বলেন, বর্তমানের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর হিসাব ব্যবস্থায় অডিট প্রতিবেদনে আইটি অডিটের বিষয় উল্লেখ না থাকা বড় ঘাটতি। মানসম্পন্ন হিসাব ব্যবস্থায় সরাসরি ভাউচার ডিলিটের পরিবর্তে সংশোধনী এন্ট্রি ও অডিট ট্রেইল সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকা উচিত। অডিট ট্রেইল ছাড়া ভাউচার মুছে ফেলা কোম্পানি আইন ও করবিধির গুরুতর লঙ্ঘন। আর প্রকৃত আর্থিক চিত্র আড়াল করার উদ্দেশ্যে এমনটি করা হলে তা হিসাব জালিয়াতি ও ফৌজদারি অপরাধ।
জাতীয় গ্রিড পরিচালনাকারী ও শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পিজিসিবির মতো প্রতিষ্ঠানে সাইবার নিরাপত্তা এবং সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ যথাযথভাবে নিরীক্ষার আওতায় না আনা সুশাসনের জন্য উদ্বেগজনক। এটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন।
এদিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এ প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার থেকে ভাউচার মুছে ফেলার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বলেন, ‘আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত একটি বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটির শেয়ারদর বর্তমানে ৩৮ টাকার কাছাকাছি। পরিশোধিত মূলধন প্রায় ৯ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। এতে হাজার হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও মিউচুয়াল ফান্ডের বিপুল অর্থ বিনিয়োগ রয়েছে।
এ অবস্থায় হিসাবরক্ষণ সফটওয়্যার থেকে ভাউচার মুছে ফেলার ঘটনা, নিরীক্ষকদের পক্ষ থেকে ব্যবস্থাপনাকে চিঠি দেয়া এবং মূল অডিট প্রতিবেদনে বিষয়টি উল্লেখ না করার বিষয়গুলো বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এক্সেলে রূপান্তর করা তথ্যের ওপর নির্ভর করে নিরীক্ষা সম্পন্ন করার প্রক্রিয়াও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এসব বিষয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা না পাওয়া গেলে কোম্পানিটির প্রকৃত আর্থিক চিত্র সম্পর্কে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।