<p><br></p>
ঢাকা: সরকারি চাকরিতে নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ, পিএসসি সংস্কার এবং প্রশাসনে নগ্ন দলীয়করণের প্রতিবাদে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ভবনের সামনে ‘নির্ভীক জুলাই’ স্মৃতিস্তম্ভের পাদদেশে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দাবি ও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দামসহ কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে দেশের বর্তমান প্রশাসনিক কার্যক্রমে উদ্বেগ প্রকাশ করে বেশ কিছু গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করা হয়:
দলীয়করণ ও প্রভাব বিস্তার: গণভোটের রায় ও জুলাই সনদের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে পিএসসি, ইউজিসি, বিচার বিভাগ ও মাঠ প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে মেধা ও জ্যেষ্ঠতা না মেনে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ আনা হয়।
পিএসসির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ: সাবেক পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমকে পদত্যাগে বাধ্য করা এবং পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে আরও দুই সদস্যের আকস্মিক পদত্যাগকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ বলে উল্লেখ করা হয়।
ডিজিটাল জালিয়াতির শঙ্কা: প্রশাসন ক্যাডার থেকে চুক্তিভিত্তিক দলীয় লোক নিয়োগের মাধ্যমে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সূক্ষ্ম জালিয়াতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
শিক্ষক নিয়োগে বৈষম্য: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও ১,২০০-র বেশি মেধাবী প্রার্থীকে রাজনৈতিক স্ক্রুটিনি ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে আটকে দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়।
ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির চক্রান্ত: মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়িয়ে ২০০ করা এবং ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে ভাইভার নম্বর ৪০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা জানানো হয়।
৪৫তম বিসিএসে মেধাবীদের বঞ্চিতকরণ: পুলিশ ভেরিফিকেশনের অজুহাতে ৪৫তম বিসিএসের গেজেট থেকে ৫৬ জন চূড়ান্ত মেধাবীকে কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই বাদ দেওয়ার সমালোচনা করা হয়।
চাকরিতে স্বচ্ছতা এবং মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে দুটি ভাগে মোট ১২ দফা সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করা হয়:
ক) পিএসসি সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা:
জুলাই সনদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী পিএসসিকে পুনর্গঠন করে ৩টি পৃথক কমিশন গঠন এবং সংসদ ও বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে স্বচ্ছ বাছাই কমিটি তৈরি করা।
৯ম ও ১০ম গ্রেডসহ সব সরকারি চাকরি পিএসসির অধীনে আনা এবং মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপমুক্ত রেখে আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা।
কোডভিত্তিক খাতা মূল্যায়ন, 'কম্পিটেন্সি বেইজড ইন্টারভিউ' (CBI), এবং ‘ওয়ান ইয়ার, ওয়ান বিসিএস’ নীতি বহাল রাখা।
বার্ষিক জনবল চাহিদার ভিত্তিতে একটি সমন্বিত ও নির্দিষ্ট নিয়োগ ক্যালেন্ডার প্রকাশ করা।
বিজ্ঞপ্তি থেকে চূড়ান্ত নিয়োগ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ ১২ মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা।
রাজনৈতিক পরিচয় বা পারিবারিক সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে বৈষম্য না করে কেবল সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ ছাড়া কাউকে বাদ না দেওয়া।
খ) পুলিশ ভেরিফিকেশন ও নিয়োগে স্বচ্ছতা:
পুলিশ ভেরিফিকেশনের উদ্দেশ্য, মানদণ্ড ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে প্রকাশ করা।
জাতীয় পরিচয়পত্র ও সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে সর্বোচ্চ ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে দ্রুত ভেরিফিকেশন শেষ করা।
ভেরিফিকেশনে নেতিবাচক তথ্য পেলে প্রার্থীকে লিখিত কারণ জানানো এবং আপিলের সুযোগ রাখা।
মৌখিক পরীক্ষার জন্য অভিন্ন মূল্যায়ন কাঠামো ও পরীক্ষকদের মূল্যায়নের রেকর্ড সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।
অস্বচ্ছতা দূর করতে ভাইভা পরীক্ষার অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ করা।
প্রশ্নফাঁস ও প্রক্সি পরীক্ষা প্রতিরোধে আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল নিয়োগ করা।
সংবাদ সম্মেলনে দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দেওয়া হয় যে, সরকারি চাকরি কোনো রাজনৈতিক দলের অনুগতদের পুরস্কৃত করার মাধ্যম নয়, বরং রাষ্ট্রের সেবা করার পবিত্র দায়িত্ব। এর ভিত্তি হওয়া উচিত একমাত্র যোগ্যতা ও সততা। পরিশেষে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে ছাত্রসমাজ ও সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।