দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে এক নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে। মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালু করা এবং আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট উদ্যোগে পুরো অঞ্চলের চেহারায় পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। সম্প্রতি খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চল সফরকালে সরকারের শীর্ষপর্যায়ের এসব পদক্ষেপ এই জনপদের মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।
গত ৫ নভেম্বর খুলনা ও বাগেরহাট সফর করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় থমকে থাকা অর্থনীতিকে গতিশীল করতে তিনি তিনটি প্রধান বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দেন:
বন্ধ কারখানা চালু: দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা পাটকলসহ অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পুনরায় প্রাণ ফিরিয়ে আনা।
বিনিয়োগ আকর্ষণ: দেশি ও বিদেশি—বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগকারীদের মোংলা ও খুলনা অঞ্চলে শিল্প স্থাপনে উৎসাহিত করা।
অবকাঠামোগত সহায়তা: নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের স্বার্থে নতুন ও পুরাতন শিল্পে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা।
৪,০৬৮ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প: মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলার সক্ষমতা বাড়াতে সরকার ৪ হাজার ৬৮ কোটি ২৩ লাখ টাকার একটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ৫ নভেম্বর মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের ৯ নম্বর জেটিতে এই ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।
আন্তর্জাতিক মানের দুটি নতুন কনটেইনার জেটি নির্মাণ।
বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ৩ লাখ ৯৪ হাজার টিইউটিতে (TEU) উন্নীত করা।
প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে আঞ্চলিক সামুদ্রিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস সম্প্রসারণ।
সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিকায়নের ফলে এই বন্দর ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস হাবে পরিণত হবে।
মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ছাড়াও খুলনা থেকে দেশের উত্তরাঞ্চলের শেষ সীমান্ত পঞ্চগড় পর্যন্ত একটি বৃহৎ ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিজিয়ন’ বা শিল্প করিডোর গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই শিল্পায়নের গতি বাড়াতে বাংলাদেশ ও চীনের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সুশীল সমাজ ও স্থানীয় নেতৃত্বের প্রত্যাশা
খুলনার বিভিন্ন শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ মনে করছেন যে, এই পরিকল্পনাগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন ঘটলে:
পাটকল ও অন্যান্য কারখানা চালুর মাধ্যমে বেকারত্ব দূর হবে।
আঞ্চলিক চিংড়িশিল্প এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের বিকাশ ঘটবে।
কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ফলে সামগ্রিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
মোংলা বন্দর ও খুলনা শিল্পাঞ্চলের এই পুনর্জাগরণ কেবল স্থানীয় পর্যায়ে নয়, বরং গোটা দেশের অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে। পোশাক, হিমায়িত চিংড়ি ও কৃষিপণ্য রপ্তানি সহজ হওয়ার পাশাপাশি ভারত, নেপাল ও ভুটানের সাথে ট্রানজিট বাণিজ্যে মোংলা বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পরিশেষে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন ঘটলে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক যাত্রা দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতেও অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।