রামপুরায় ১২ কোটি মূল্যের ডিজি সোহেলের নামে সাত তলা বাড়ি, বাড্ডায় নিজ নামে ৬ কাঠার প্লট- যার বাজার মূল্য ৬ কোটি টাকা, ডিজির চেয়ারে বসে কিনেছেন কক্সবাজারের ভিআইপি এলাকায় দুই কোটি টাকা দামের ফ্ল্যাট, গাজীপুরে রিসোর্ট, দুবাইয়ে ফ্ল্যাট, কানাডায় বাড়ি, প্রভাষক থেকে অধ্যাপক ডিজি সোহেলের আয় আওয়ামী-বিএনপি জমানার সব সময়, প্রধানমন্ত্রীর দুপুরের খাবার খরচ ১০০ টাকা, ডিজি সোহেলের সম্পত্তি শতকোটি। ডিজির চেয়ারে থেকেও আকড়ে আছেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির চেয়ার।
Photo of শিক্ষা সংবাদ শিক্ষা সংবাদ Send an emailNovember 5, 2026
Facebook X LinkedIn Messenger Share via Email Print
স্যাকলাইন আরাফাত ও আফসানা অনু: “দুর্নীতিতে নিমজ্জিত মাউশির ডিজি, শিক্ষার হাল ধরবে কে?” শিরোনামে গত ২৭ অক্টোবরে শিক্ষা সংবাদে প্রকাশিত সংবাদে মাউশির বেসরকারি মাধ্যমিক, সরকারি মাধ্যমিক, বেসরকারি কলেজ ও সাধারণ প্রশাসন শাখায় একচ্ছত্র আধিপত্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার ঘুস দুর্নীতির বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদ সবার নজরে এসেছে। এরপর ব্যক্তি প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের দুর্নীতির দায় নিয়ে মাউশির পক্ষ থেকে প্রতিবাদলিপিটিও নন্দিত পাঠক সমাজ দেখেছেন। ডিজি সোহেল কি মাউশির এই দুইটি উইং থেকেই দুর্নীতি করছেন? অন্যান্য উইং – মাউশির বিভিন্ন প্রজেক্ট, শিক্ষা ক্যাডারের রমরমা বদলি বাণিজ্য করে অবৈধ এসব টাকা রাখছেন কোথায়? এসব প্রশ্ন শিক্ষা সংবাদের কাছে জানতে চেয়েছেন পাঠকরা। পাঠকদের কাছে দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেই ফের অনুসন্ধানে নামে শিক্ষা সংবাদের অনুসন্ধান টিম। অনুসন্ধান টিমের অনুসন্ধানে চোখ চড়কগাছ। অনুসন্ধানে মেলে অধ্যাপক সোহেলের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পাহাড়। দুর্নীতিতে তিনি চ্যাম্পিয়নশীপ অর্জন করেছেন। নিন্দুকেরা বলছেন, ‘তার স্থাবর-অস্থাবর ও আর্থিক সম্পদের হিসাব কষতে প্রয়োজন ‘সুপার ক্যালকুলেটর’!’
ডিজি সোহেলের ব্যক্তি নামে রামপুরায় সাড়ে সাত তলা বাড়ি যার মূল্য ১২ কোটি টাকা
ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে একটু এগিয়ে গেলেই বাড্ডায় অবস্থিত মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের সাড়ে ৭ তলা বাড়ি। পাঁচ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে ঐ বছরের (২০২৪) ২৯ সেপ্টেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমিক শাখার পরিচালক পদে পদায়ন পান প্রফেসর ড. সোহেল। ঘুস দুর্নীতিতে পুরো উইং দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হয়ে পরে শুধুমাত্র এই একটি মাত্র ব্যক্তির কারণে। যার ধারাবাহিকতা এখনও চলছে। অঞ্চল থেকে রিজেক্ট হওয়া শত শত ফাইল ৩ থেকে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে এমপিওভুক্তি, এমপিও স্থগিত করে তদন্ত ছাড়া, নাম সর্বস্ব তদন্ত ও শুনানীর নাম করে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করে এমপিও চালু, সরকারি মাধ্যমিকে বদলি করে, অন্তত মাধ্যমিকের পরিচালক পদে থাকার সময়েই ৫১ কোটি টাকা কামিয়েছিলেন তিনি যা ইতিমধ্যে দৈনিক পত্রিকাতেও এসেছে। আর এসব টাকা দিয়েই শুরু হয় সাড়ে সাত তলা বাড়ির কাজ। রামপুরার সাড়ে সাত তলা বাড়ি তৈরির কাজ প্রায় শেষ এখন চলছে রঙ ও উন্নত মানের মার্বেল পাথর দিয়ে ফিনিশিংয়ের কাজ। মাধ্যমিক উইংয়ের পরিচালক থাকা অবস্থায় নির্মাণ কাজ শুরু হওয়া বাড়িটির বর্তমানে উন্নত মানের ফিনিশিংয়ের কাজ চলছে মাউশি মহাপরিচালক পদে আসীন থাকা অবস্থায়।
শিক্ষা সংবাদের হাতে থাকা খতিয়ানের কপিতে দেখা যায় বাড়িটির রেজিস্ট্রেশন করা খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের নামে। জমির দলিলে পিতার নাম তাবারুকুল ইসলাম খান ও মাতা নাছিমা আক্তার খানম। গুলশান থানার বাড্ডা মৌজার ৩৪৯৬২ নম্বর খতিয়ানে জমিটির দাগ নম্বর ১৭১২১। ১৮৩১, কৃষি ব্যাংক রোড, পোস্ট অফিস গলি, পূর্ব বাড্ডা। বাড়িটির আশেপাশের কয়েকজন বাড়ির মালিক ও ফ্ল্যাট মালিকের সাথে কথা বলে শিক্ষা সংবাদ। তাদের ভাষ্যমতে, বর্তমানে বাড়িটির দাম কমপক্ষে ১২ কোটি টাকা। পাঁচ আগস্টে ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থান না ঘটলে হয়ত প্রফেসর সোহেলের এই সাড়ে সাত তলা বাড়ি আর হতো না। দুষ্টলোকেরা বলেন, জুলাই আন্দোলনকারীদের শুধুমাত্র এই একটি কারণেই প্রফেসর সোহেল ধন্যবাদ দিতেই পারেন।
রামপুরায় সাড়ে সাত তলা বাড়ি ও ডানে ৬ কাঠার প্লট। ছবি:শিক্ষা সংবাদ
শিক্ষা ক্যাডারের (বিএনপিপন্থী) জ্যৈষ্ঠ কর্মকর্তা বলছেন, আওয়ামী জমানায় গোপনে আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত করে এবং স্কাউটের নামে বিভিন্নভাবে অর্থ কামিয়ে এই বাড়ির জায়গাটি ক্রয় করেছিলেন প্রফেসর সোহেল। মাউশিতে আসার পর আগুল ফুলে কলাগাছ হয়ে বাড়ির নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করছেন।
গুলশানের বাড্ডা মৌজায় প্রফেসর সোহেলের আরও ছয় কাঠা জমি, মূল্য ৬ কোটি টাকা
গুলশান থানার বাড্ডা মৌজার ৩৪৯৬২ নম্বর খতিয়ানের আগের জমিটির দাগ নম্বর ছিল ১৭১২১। আর একই মৌজার ৩৯৫৯০ নম্বর খতিয়ানের ১৬৭৫৭ নম্বর দাগে রয়েছে ৬ কাঠা জমি। জমির রেজিস্ট্রেশন পেপার ঘেটে দেখা যায় জমির মালিক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের নামে। জমির দলিলে পিতার নাম তাবারুকুল ইসলাম খান ও মাতা নাছিমা আক্তার খানম। অর্থ্যাৎ শিক্ষা সংবাদের অনুসন্ধানী টিম এই ৬ কাঠা জমির মালিক যে খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল তা নিশ্চিত হয়েছে।
ডিজির চেয়ারে বসে কক্সবাজারের ভিআইপি রোডে দুই কোটি টাকা দামের ফ্ল্যাট
কক্সবাজারের সবচেয়ে ভিআইপি এলাকা ভিআইপি রোড। আর সেই ভিআইপি রোডে পূর্বিতা সুলতানা ভিলার ১২ তলা ভবনে রয়েছে মাউশি ডিজির ১৭৫০ স্কয়ার ফিটের একটি জাঁকজমকপূর্ণ ফ্ল্যাট। যার বর্তমান বাজার মূল্য দুই কোটি দশ লক্ষ টাকা। যা অংকে লিখলে ২,১০,০০,০০০ টাকা মাত্র। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে আসীন হবার পরে কক্সবাজার জেলা শিক্ষা অফিসারের মাধ্যমে ফ্ল্যাটটি কেনেন তিনি।
কক্সবাজারের ভিআইপি রোডে দুই কোটি টাকা দামের ফ্ল্যাট। ছবি: শিক্ষা সংবাদ
কক্সবাজারের সবচেয়ে আলোচিত রাস্তা মেরিন ড্রাইভ সড়কেও রয়েছে ডিজির অন্তত ২০ কোটি টাকার প্লট। ভবিষ্যতে রিসোর্ট করার পরিকল্পনা আছে তার। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি বিষয়টি শিক্ষা সংবাদের অনুসন্ধান টিমকে জানিয়েছেন। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হতে পারেনি টিম।
গাজীপুরে রিসোর্ট, দুবাইয়ে ফ্ল্যাট, কানাডায় বাড়ি
একাধিক সূত্র মারফতে জানা গেছে, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর সোহেলের গাজীপুরে রিসোর্ট, দুবাইয়ে ১৫ কোটি মূল্যের ফ্ল্যাট, কানাডায় ২৫ কোটি টাকা মূল্যের বাড়ি রয়েছে। দুর্নীতির দায়ে দেশ ছাড়তে হলে তিনি কানাডায় চলে যাবেন এমনটাই বলছিলেন ডিজির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহচর। গাজীপুরে রিসোর্ট, দুবাইয়ে ফ্ল্যাট, কানাডায় বাড়ির বিষয়টি শিক্ষা সংবাদ’কে জানিয়েছেন ডিজির ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব ব্যক্তি শিক্ষা সংবাদের কাছে এই সম্পদের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও স্বাধীনভাবে বিষয়টি যাচাই করতে পারেনি শিক্ষা সংবাদের অনুসন্ধানী টিম। তবে ডিজির ঘনিষ্ঠজনেরা এই মর্মে নিশ্চিত করেছেন যে, ফরেন মিনিস্ট্রি ও দুদক এবং এনবিআর অনুসন্ধান করলে অবশ্যই তদন্তে এগুলো বের হয়ে আসবে।
শিক্ষা ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, ‘প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের যে সম্পদের বিবরণী আপনাদের (শিক্ষা সংবাদ) হাতে এসেছে তা খুবই সামান্য। স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করলে ডিজি সোহেলের হাজার কোটি টাকার সম্পদের হিসেব বের হয়ে আসবে। শুধু তার নামে নয় তার পরিবারের সদস্যের নামেও অনুসন্ধান চালাতে হবে।’
গত ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ইং তারিখে ‘দুর্নীতিতে নিমজ্জিত মাউশির ডিজি, শিক্ষার হাল ধরবে কে?’ শিরোনামে মাউশি ডিজির ব্যক্তিগত দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের দায় মাউশি নিয়ে মাউশির অন্যান্য কর্মকর্তারা প্রতিবাদলিপি দিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে পাঠকদের আগ্রহের জায়গা যে, যেহেতু ডিজির দুর্নীতির দায় নিল মাউশি। তাহলে কি ডিজির এসব সম্পদের অংশীদারও হয়েছেন মাউশির অন্যান্য কর্মকর্তারা? বাস্তবে দুর্নীতি করে ডিজি সম্পদের পাহাড় গড়েছেন নিজ নামে তবে সম্পদের ভাগ না পেলেও প্রতিবাদ জানায় মাউশির পক্ষ থেকে তারই আজ্ঞাবহ কিছু কর্মকর্তা।
প্রভাষক থেকে অধ্যাপক ডিজি সোহেলের আয় আওয়ামী-বিএনপি জমানার পুরো সময়
খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল ১৯৯৬ সালের ১৩ আগস্ট ১৬ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের প্রাণীবিদ্যা বিষয়ের প্রভাষক পদে ৫৪তম (বিষয়ভিত্তিক) মেধা তালিকা নিয়ে কবিরহাট সরকারি কলেজে কর্মজীবন শুরু করেন। ২০০১ সালে বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী সে সময়ের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। নিয়োগের মাত্র দুই মাসের মাথায় প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেলে তিনি সাত দিনের জন্য রাজশাহী কলেজে বদলি হয়ে ফের প্রতিমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব পদে ফিরে এসে এই পদে থাকেন ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়ার আগ পর্যন্ত। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতা ছাড়লে তৎকালীন তত্ববধায়ক সরকার ও পরবর্তীতে সেনা শাসিত সরকারের সাথে লিয়াজু করে সহকারী একান্ত সচিব থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার সহকারী পরিচালক পদে পদায়ন পান। আওয়ামী সরকার ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় বসলে আওয়ামী লীগের সাথে লিয়াজু করে মাত্র পাঁচ মাস এই চেয়ারে থাকতে পেরেছিলেন তৎকালীন সহকারী অধ্যাপক সোহেল। এরপর তাকে ভোলা সরকারি কলেজে বদলি করা হয়। মাত্র চার মাসের মাথায় আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ছুটি নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেন আওয়ামীপন্থী এক শিক্ষকের কাছে। টানা তিন বছর ছুটি শেষে ফেরেন শিক্ষায়। পদায়ন হয় জামালপুরে। এরপর দিনাজপুর সরকারি কলেজ। সেখান থেকেই অন্তর্বর্তী অধ্যাপক ইউনূস সরকারের আমলে মাউশির মাধ্যমিকের পরিচালক এবং বিএনপি সরকারে আসলে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে আ ন ম এহছানুল হক মিলন দায়িত্ব পেলে অধ্যাপক সোহেলকে বানান পিএস। একই সাথে দেওয়া হয় মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্বে। অর্থাৎ মাধ্যমিকের পরিচালক, মাউশির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এবং মন্ত্রীর পিএস। মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পাওয়ার পরেই পেয়ে যান ডিজির চলতি দায়িত্ব।
প্রশ্ন উঠতে পারে আওয়ামী আমলে তিনি কি সুযোগ পেলেন ?
আওয়ামী আমলে মাউশির যতগুলো মহাপরিচালক আসছে সবগুলোর সাথেই আঁতাত করে চলতেন খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। আর আঁতাতের দায়িত্বে ছিলেন খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের বর্তমান পিএ (ডিজির পিএ) মোহাম্মদ ফরহাদ হোসেন। আওয়ামী লীগের আমলে যতগুলো ডিজি আসছে মাউশিতে সবগুলো ডিজির পিএ’র দায়িত্বে ছিলেন এই ফরহাদ। ১৭ বছর আওয়ামী জমানার স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আসে কিন্তু ফরহাদ মাউশিতেই থেকে যায়। অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল ডিজির চেয়ারে আসীন হবার সাথে সাথে খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের পিএ বনে যান সর্বকালের ডিজির পিএ ফরহাদ। মাউশিতে এই ফরহাদের মাধ্যমে আওয়ামী আমলের এমন কোনো সুযোগ শিক্ষা ক্যাডারে নেই যা গ্রহণ করেননি অধ্যাপক সোহেল। বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা প্রকাশ্যে যখন কোনো কর্মকাণ্ডে আসতে পারতেন না তখন তার হাতিয়ার হয়ে ওঠে বাংলাদেশ স্কাউটস। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দিপু মনি যখন পররাষ্ট্র মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন তাকে নিয়ে আলোচনা উঠেছিল বিদেশে যাওয়া মন্ত্রী হিসেবে। তবে অধ্যাপক সোহেলের ক্ষেত্রে সেই আলোচনা না উঠলেও সাবেক ডিজিদের মদদে এবং স্কাউটসের বাহানায় শিক্ষা ক্যাডারের ইতিহাসে তিনিই সর্বোচ্চ বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। আমেরিকা, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্ডিয়াসহ ১১ টি দেশে আওয়ামী সরকারের সরকারি খরচে বিদেশে গিয়েছেন তিনি। শুধু তাই নয় বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের হাত থেকে ৮টি পুরষ্কার গ্রহণ করেছেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা ক্যাডারের ১৪ থেকে ৩০ বিসিএসের অন্তত ২০ জনের সাথে কথা বলে শিক্ষা সংবাদ। তারা জানান, ‘শিক্ষা ক্যাডারের একটি মাত্র বদলি পাবেন না যা ডিজি ও সাবেক পিএস (মন্ত্রী) সোহেলের নির্দেশনা ছাড়া এবং টাকা ছাড়া হয়েছে। শিক্ষা ক্যাডারের বদলি মানেই সোহেল। মন্ত্রণালয় যোগাযোগ করলেও সেখান থেকে বলা হয় সোহেলের কাছে যাও।’
সোহেলের এই মহাদুর্নীতির দায় কি শিক্ষামন্ত্রী এড়াতে পারেন?
এ বিষয়ে শিক্ষা সংবাদের প্রথম পর্বের নিউজ শেয়ার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক কামরুল হাসান মামুন তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, “এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর এহসানুল হক মিলন শিক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তার নাটকীয় উত্থান দেখে আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। একজন জাতীয় মন্ত্রী হয়েও উনি আজও চাঁদপুর পার হতে পারলেন না। আমাদের শিক্ষা মন্ত্রী পুরো দেশের মন্ত্রী হতে পারলেন না। মন্ত্রী হয়েই এই সোহেল সাহেবকেই নিজের এপিএস এরপর নানা পদ ঘুরে শেষে এখন মাউশির ডিজি বানিয়েছেন। সোহেল সাহেবের দুর্নীতির দায় কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রীর উপরেও বর্তায়। এখন বুঝতে পারছি। ইনি কোন প্রকৃতির মানুষ। অতি দ্রুত তার বিষয়ে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষা ক্যাডার থেকে পেষণে প্রশাসনিক পদই হলো শিক্ষকদের রাজনীতির পথে আনার রাজপথ। একই পথ আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও আছে। এইসব পথ খোলা রেখে শিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়ন জিন্দেগিতেও সম্ভব না।”
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ডিজি সোহেলের শত শত কোটি টাকা দুর্নীতির বিষয় নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) – এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, কোনো সরকারি কর্মচারীর পক্ষে, যত উচ্চ পদেরই হোক, কোনোভাবেই বৈধ আয়ের ওপর নির্ভর করে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়া অসম্ভব। মাউশি’র মহাপরিচালক যদি শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়ে থাকেন এবং সরকারি কর্মচারী হিসেবে তার প্রাপ্য বেতন-ভাতার বাইরে অন্য কোনো বৈধ আয়ের উৎসের প্রমাণ না দিতে পারেন, তাহলে তা নি:সন্দেহে তার বৈধ আয়ের সূত্রের বাইরে থেকে, অর্থাৎ অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত হতে বাধ্য। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত।
এ বিষয়ে কথা বলতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেকের মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠিয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো প্রতিউত্তর দেননি।
এসকল বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে শিক্ষামন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) নুরুল আফসার দীপু কল রিসিভ করে শিক্ষা সংবাদের প্রশ্ন জানতে চান। পরবর্তীতে প্রশ্ন শুনে তিনি জানান, শিক্ষামন্ত্রী বর্তমানে সামছুল হক খান উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি কর্মসূচিতে ব্যস্ত আছেন এবং এরপর তাঁর আরেকটি নির্ধারিত স্থানে যাওয়ার কথা রয়েছে। স্যার ফ্রি হলে আমি স্যারকে এ বিষয়ে জানাবো।
ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের অনিয়ম সংক্রান্ত অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহাদী আমিনের মন্তব্য জানতে চাইলে তার পিএস, জিসান তারিকুল ইসলামের মুঠোফোনের নাম্বার দিয়ে বলেন, স্যারের মিডিয়া উনি দেখেন। পরবর্তীতে তারিকুল ইসলাম শিক্ষা সংবাদ’কে জানান, উপদেষ্টা মহোদয়ের পক্ষে তিনি নিজে কোনো বক্তব্য বা মন্তব্য করেন না। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রী বা উপদেষ্টার সাথেই সরাসরি কথা বলা সমীচীন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে একটি প্রাতিষ্ঠানিক অনুষ্ঠানে ব্যস্ত থাকায় উপদেষ্টার সঙ্গে তার এখনো দেখা হয়নি। অনুষ্ঠান শেষে উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা হলে তিনি বিষয়টি তাঁকে জানাবেন।
ডিজি সোহেলের কোটি কোটি টাকা দুর্নীতির বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া শিক্ষা সংবাদ’কে বলেন, ‘তার এত এত দুর্নীতি, এত অভিযোগ; এ বিষয়ে আমি কিছুই বলতে চাই না। যা করার ৮ তারিখে দেখব।’
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গরা বলছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। রাষ্ট্রের অর্থের ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছেন। তিনি নিজে দুপুরের খাবার খাচ্ছেন ১০০ টাকায়। অথচ শিক্ষার সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, সেই দপ্তরের প্রধান শত কোটি টাকা বানিয়েছেন। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। প্রধানমন্ত্রীর নজর দেওয়া উচিত।’