বাংলাদেশ রেলওয়ের অনবোর্ড ও ক্যাটারিং সেবায় নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে কর্মী নিয়োগে অর্থ বাণিজ্য, বেতন আত্মসাৎ এবং নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সুবর্ণ এক্সপ্রেস, গোধূলী এক্সপ্রেস, মহানগর এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস এবং মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেসের অনবোর্ড কার্যক্রমে ম্যানেজার, স্টুয়ার্ড ও ক্লিনার পদে কর্মরতদের বঞ্চিত করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা।
প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহ আলমের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগে বলা হয়েছে, ক্লিনারদের জন্য ১৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং ম্যানেজারদের প্রায় ২০ হাজার টাকা নির্ধারণকৃত মাসিক বেতন কাঠামোর বিপরীতে পাঁচটি ট্রেনের জন্য ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও প্রকৃত কর্মীরা তার পূর্ণ সুফল পান না। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এক বাণিজ্যিক কর্মকর্তার মতে, অনেক কর্মীরই নিয়োগপত্র নেই এবং ডিউটি বরাদ্দের ক্ষেত্রেও অর্থনৈতিক লেনদেনের ঘটনা ঘটছে।
চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের একাধিক সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। পটিয়ার বাসিন্দা আনিছুর রহমান ও আনোয়ারার আবদুর রাজ্জাক জানান, স্টুয়ার্ড পদে চাকরির আশ্বাসে জমি বিক্রির মাধ্যমে বা ধারদেনা করে টাকা দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তারা চাকরি কিংবা টাকা কোনোটিই পাননি, আর কোনো রসিদ বা লিখিত চুক্তি না থাকায় আইনি প্রতিকার পেতেও তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
রেলওয়ের এই অনবোর্ড সেবা কেবল আর্থিক অনিয়মেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি অপরাধের আখড়ায় পরিণত হওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। গত ৪ আগস্ট ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস থেকে ৪ হাজার ৮৫০ পিস ইয়াবাসহ স্টুয়ার্ড মাহবুব রহমান গ্রেপ্তার হন এবং এর আগেও একই ট্রেন থেকে ৩৩ হাজার ৫০০ পিস মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। র্যাব-৭-এর সহকারী পরিচালক এ আর এম মোজাফফর হোসেনের ভাষ্যমতে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীর অপরাধের সঙ্গে মালিকপক্ষের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যদিও অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠানের ওপর বর্তায় কি না তা তদন্তসাপেক্ষ।
এছাড়াও চলতি বছরের ২০ মার্চ সুবর্ণ এক্সপ্রেসের টিকিট কালোবাজারির অভিযোগে এস এ কর্পোরেশনের দুই স্টুয়ার্ডকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রাথমিকভাবে সাড়ে সাত হাজার টাকা জরিমানা করে কৈফিয়ত তলব করা হয়। অন্যদিকে পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন ট্রেনে ‘গেস্ট’ পরিচয়ে বিনা টিকিটে যাত্রী তোলার মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে, যার একটি অংশ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে ভাগবাটোয়ারা হয় বলে জানা যায়।
ঠিকাদার নাছির উদ্দিন মোহনের মতো অন্যান্য ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অনিয়মের পাহাড় জমলেও প্রভাবশালী মহলের সুবাদে এস এ কর্পোরেশন রেলওয়ের বিভিন্ন টেন্ডার ও ঠিকাদারি কাজে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখে অস্বাভাবিকভাবে নিজেদের সম্পদ ও ব্যবসা প্রসারিত করে চলেছে। তবে এসব টেন্ডার প্রক্রিয়া ও অবৈধ প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট নথিপত্র ও নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাই অপরিহার্য।
অভিযোগের বিষয়ে এস এ কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহ আলম জানান যে কোনো অপরাধী ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠান নিতে পারে না এবং এ বিষয়ে ইতোমধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি এবং ব্যস্ততার অজুহাতে পরে কথা বলার কথা বলেন। অন্যদিকে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোছাম্মৎ কামরুন্নেছা এ বিষয়ে কমার্শিয়াল বিভাগের প্রধানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিলেও প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক সঞ্জিত কুমার বিশ্বাস ও অতিরিক্ত প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক মো. শওকত জামিল মোহসীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান মনে করেন যে ট্রেনে মাদক বা অপরাধের ঘটনা রেলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে এবং অভিযুক্তরা ঠিকাদারের কর্মী হওয়ায় মালিকপক্ষের সম্পৃক্ততা তদন্ত সাপেক্ষে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার, নিয়োগে অনিয়ম ও রাজস্ব ক্ষতির সত্যতা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং রেলওয়ের রাজস্ব সুরক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।