বিতর্ক, অনিয়ম আর পলায়নের পরও কোন জাদুবলে রাজধানীতে পুনর্বাসিত কাস্টমস উপকমিশনার আহাদ


নিজস্ব প্রতিবেদক , আপডেট করা হয়েছে : 04-11-2026

বিতর্ক, অনিয়ম আর পলায়নের পরও কোন জাদুবলে রাজধানীতে পুনর্বাসিত কাস্টমস উপকমিশনার আহাদ

একজন সরকারি কর্মকর্তা প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের অনুমতি ছাড়াই বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পরও কোন অদৃশ্য মহলের প্রভাবে-প্রশ্রয়ে দেশে ফেরার অনুমতি পেলেন এবং খোদ রাজধানীতেই রাজস্ব খাতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিলেন; সে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট, মতিঝিল ডিভিশনের উপকমিশনার আবু হানিফ মোহাম্মদ আবদুল আহাদের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠার পরও তার স্বপদে বহাল থাকা নিয়ে কর প্রশাসনের অভ্যন্তরে তীব্র সমালোচনা ও তোলপাড় শুরু হয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস থেকে শুরু করে রাজধানীর পোস্তগোলার আইরিশ পাব এন্ড রেস্টুরেন্ট, আখাউড়া স্থলবন্দর এবং সর্বশেষ ঢাকা ভ্যাট জোন—যেখানেই তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই সৃষ্টি হয়েছে নানা নজিরবিহীন বিতর্ক। এমনকি ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কর্মস্থল থেকে পালিয়ে বিদেশে চলে গেলেও রহস্যজনকভাবে তিনি বিভাগীয় মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। এই ঘটনায় ব্যবসায়ী মহল ও কাস্টমসের সাধারণ অংশীজনদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিশেষ করে তাঁর বিরুদ্ধে যাঁরা অতীতে অভিযোগ করেছিলেন, তাঁরা এখন প্রতিশোধের আশঙ্কায় চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

একজন সরকারি কর্মকর্তা প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের অনুমতি ছাড়াই বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পরও কোন অদৃশ্য মহলের প্রভাবে-প্রশ্রয়ে দেশে ফেরার অনুমতি পেলেন এবং খোদ রাজধানীতেই রাজস্ব খাতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিলেন; সে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

২০১৭ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে সহকারী কমিশনার (জেটি পরীক্ষণ) হিসেবে যোগদানের পরপরই আবু হানিফ মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বড় ধরনের বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। সেখানে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়ে সাধারণ সিঅ্যান্ডএফ কর্মীদের সঙ্গে তার তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়। তার বিরুদ্ধে হয়রানি ও অনৈতিক সুবিধা দাবির অভিযোগ এনে ক্ষুব্ধ সিঅ্যান্ডএফ কর্মীরা তাকে কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করেন এবং তার নামফলক ভাঙচুর করেন।

পরবর্তীতে, কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট ও কর্মীদের তীব্র দাবির মুখে ও পরিস্থিতি শান্ত করতে কর্তৃপক্ষ ওই বছরেরই ২৬ জানুয়ারি তাকে তাৎক্ষণিকভাবে চট্টগ্রাম থেকে বদলি করতে বাধ্য হয়।

তৎকালীন বদলির আদেশে বলা হয়, ‘সার্বিক কাজকর্ম সন্তোষজনক মর্মে পরিলক্ষিত না হওয়ায় সুশাসন ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা কাঠামোর জিরো টলারেন্স নীতির আওতায়’ আব্দুল আহাদকে বদলি করে কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমিতে পদায়ন করা হয়েছে। ওই আদেশে ‘বদলিকৃত কর্মকর্তার দাপ্তরিক আচার-আচরণ ও নৈতিকতা, সেবাধর্মী মানসিকতা গঠন এবং ব্যক্তিত্বের বিকাশের বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে সামগ্রিক উন্নতির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধনের পদক্ষেপ গ্রহণের’ জন্য একাডেমির মহাপরিচালককে বলা হয়।

২০২১ সালের ২৩ মার্চ রাজধানীর পোস্তগোলা এলাকার আইরিশ পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট অভিযানে গিয়ে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কতিপয় সদস্যের মদ্যপানের দৃশ্য ধরা পড়ে প্রতিষ্ঠানটির সিসিটিভির ফুটেজে। উক্ত অভিযানে প্রায় ৩০ জনের দলটির নেতৃত্বে ছিলেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তৎকালীন সহকারি পরিচালক আবু হানিফ মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ। সেসময় বারে দেশি-বিদেশি মদ উদ্ধারে একদিকে যেমন ব্যস্ত ছিলেন দলটির একাংশ অন্যদিকে মদ্যপানেও ব্যস্ত ছিলেন অনেকে।

কাস্টমস গোয়েন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি স্কটল্যান্ড এবং লন্ডন থেকে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ দামি ব্র্যান্ডের হুইস্কি ও ভদকা মজুত করে বিক্রি করছিল। কিন্তু অভিযানের সময় তারা এসব বিদেশি মদ আমদানির কোনো বৈধ নথিপত্র বা লাইসেন্স দেখাতে না পারায় শুল্ক গোয়েন্দারা বিপুল পরিমাণ অবৈধ মদ জব্দ করেন।

এই অভিযানটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় কারণ এই আইরিশ পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট লিমিটেডের মালিকানার সঙ্গে দেশের আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নূর ইসলাম সম্পৃক্ত। অভিযোগ ওঠে যে, শেখ নূর ইসলাম ও তাঁর পরিবার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ মদের ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, অভিযান পরিচালনাকারী দলের একজন আনসার সদস্য নিজে মদপান করেন। পরে তার কাছ থেকে নিয়ে শুল্ক গোয়েন্দার সদস্যরাও মদপান করেন। অভিযান চলাকালীন বারে কর্মরত কয়েকজনকে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।

এদিকে, বারে অভিযানে গিয়ে মদ্যপান কতটা যৌক্তিক এমন প্রশ্নে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার অনুরোধ করে আবু হানিফ মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ এই প্রতিবেদককে বলেন, "আমার কাছে মনে হয়েছে তারা কিছু একটা খেয়েছে। অভিযানের নেতৃত্বে থাকায় আমি ব্যস্ত ছিলাম নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ে। তবে সেরকম কিছু যদি ঘটেই থাকে তাহলে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"

তবে আইরিশ পাব থেকে জব্দকৃত পণ্যের হদিস না মেলা এবং শুল্ক বিভাগের কিছু অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযানের নেতৃত্ব দানকারী তৎকালীন সহকারী পরিচালক আবু হানিফ মোহাম্মদ আব্দুল আহাদের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকায় ব্যবসায়ী মহলে বিতর্ক ও অনিয়মের নানা অভিযোগ ওঠে। এনিয়ে পরবর্তীতে দেশের শীর্ষস্থানীয় একাধিক গনমাধ্যম এবং টেলিভিশন চ্যানেলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলো। এই ঘটনায় তৎকালীন সরকারের ইতিবাচক ভাবমূর্তি ক্ষুন্নের জেরে নীতিনির্ধারণী মহলের তীব্র অসন্তোষের মুখে দ্বিতীয় দফায় বদলি করা হয় বিতর্কিত এই কাস্টমস কর্মকর্তাকে।

আইরিশ পাব অ্যান্ড রেস্টুরেন্টের ঘটনার পর আহাদকে আখাউড়া স্থলবন্দরে বদলি করা হয়। সেখানে উপকমিশনার পদে দায়িত্ব পালনকালেও আবু হানিফ মো. আব্দুল আহাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের চরম নজির দেখা যায়।

অভিযোগ রয়েছে, বন্দর থেকে নিলামে ব্যবসায়ীদের ক্রয়কৃত কোটি টাকার বৈধ মালামাল বেআইনিভাবে জব্দ করে নিয়ে যান এই কর্মকর্তা। শুধু তাই নয়, সেই সময় একাধিক ব্যবসায়ী আহাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা চাওয়ার পাশাপাশি চাঁদা দাবির অভিযোগ করেন। এমনকি, ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে এক ব্যবসায়ী আহাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।

২০২৪ সালের ২৫ জুন (মঙ্গলবার) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সদর) আদালতে মো. রাশেদুল হক নামে এক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী রাশেদুল হককে দীর্ঘদিন ধরে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন আহাদ। চাঁদা না দিলে ব্যবসা বন্ধ এবং মামলা দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়। এই ঘটনা স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান আবু হেনা রহমাতুল মুনিমের ঘনিষ্ঠ ও আজ্ঞাবহ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা আইনি ঝামেলা এড়াতে অবৈধভাবে কর্মস্থল ত্যাগ করে বিদেশে পালিয়ে যান। দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হলেও চলতি বছরের ৫ মার্চ অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ (আইআরডি) থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে তাকে রহস্যজনকভাবে 'অসদাচরণ ও কর্মস্থল থেকে পলায়ন'-এর গুরুতর অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দিয়ে পুনরায় স্বপদে বহাল করা হয়।

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এই ধরণের একজন বিতর্কিত কর্মকর্তার পুনর্বাসন সাধারণ কাস্টমস কর্মকর্তাদের মাঝে ক্ষোভ এবং ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের মাঝে নতুন করে প্রতিশোধের আতঙ্ক তৈরি করেছে।

আবু হানিফ মোহাম্মদ আব্দুল আহাদের এই বিতর্কিত পদায়ন এবং অতীতে উত্থাপিত সকল অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দুর্নীতি, অনিয়মের বিচারের দাবিতে গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জাতীয় ক্রাইম রিপোর্টার সোসাইটি এবং সাধারণ নাগরিক সমাজের ব্যানারে এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা তাকে অনতিবিলম্বে বরখাস্ত করে তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব ও দুর্নীতির তদন্ত করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতি জোর দাবি জানান।

ইতিমধ্যেই ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার বাসিন্দা মো. করিম আব্দুল হাইসহ বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং ব্যবসায়ী হয়রানির সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে আবু হানিফ মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, ০১৮১৭০২৩২৬৪ ফোন করে বক্তব্য নিতে হবে। অন্যদিকে, ঢাকা (দক্ষিণ) ভ্যাট কমিশনার মসিউর রহমান বলেন, ০১৮১৮২৯৪৯১৭ নাম্বারে ফোন করে বক্তব্য নিতে হবে। ভ্যাট ও শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক আব্দুর রউফ বলেন, ০১৭১১৫৪৮১২৩ নাম্বারে ফোন করে বক্তব্য নিতে হবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব বলেন, ০১৭১৫০৬৩১১১ ফোন করে বক্তব্য নিতে হবে।

জনপ্রশাসন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ মহলের ভাষ্যমতে, বারবার একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর সব অভিযোগ উঠার পরও বারংবার তার পার পেয়ে যাওয়া, অভিযোগ অনুসন্ধান এবং বিভাগীয় তদন্তের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা এবং তাদের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা প্রশাসনের অভ্যন্তরে নেতিবাচক বার্তা প্রেরণের পাশাপাশি খারাপ নজির স্থাপন করছে।


সম্পাদকমন্ডলীর উপদেষ্টা -বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ হারুন অর রশিদ, সম্পাদক -মো:এনায়েত হোসেন, সহযোগী সম্পাদক- এইচ এম মানিক

উপ-সম্পাদক- ইঞ্জিনিয়ার গোলাম ফারুক ওবি,বার্তা সম্পাদক- সবুজ ইসলাম, লিগ্যাল এডভাইজার- এডভোকেট শামীমা আক্তার।