শাখা ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আসা সরকারি বড় অঙ্কের আমানতকে কৌশল বদলে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে রূপান্তর এবং এর বিপরীতে ২৫ লাখ টাকারও বেশি কমিশন হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এনআরবি ব্যাংক পিএলসির সিলেট অঞ্চলে। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ৭৫ কোটি টাকার একটি আমানত কেন্দ্র করে এই অনিয়মের ঘটনা ঘটে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে তদন্ত শুরু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অভিযোগে উঠে এসেছে ব্যাংকটির সিলেট অঞ্চলের প্রধান (জোনাল হেড) প্রশান্ত কুমার সিংহ, বড়লেখা শাখার ব্যবস্থাপক জুনায়েদ আহমেদ এবং গোয়াইনঘাটের তৌয়াকুল বাজারের এজেন্ট সাদিকুর রহমানের নাম।
প্রাপ্ত নথি ও অভিযোগের তথ্যমতে, বিএডিসির সিলেটে নিযুক্ত এক প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রে ব্যাংকের বড়লেখা শাখার ব্যবস্থাপক জুনায়েদ আহমেদ আমানতটি এনআরবি ব্যাংকে আনতে সক্ষম হন। গত বছরের আগস্টে বিএডিসি সিলেট শাখায় হিসাব খোলে এবং সেপ্টেম্বরে ৭৫ কোটি টাকার চেক জমা দেয়। জুনায়েদ আহমেদের প্রচেষ্টায় এই আমানত আসায় ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে (সিবিএস) তাঁর নামই রিলেশনশিপ ম্যানেজার (আরএম) হিসেবে কোডভুক্ত ছিল।
তবে অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তীকালে কমিশন বাণিজ্যের স্বার্থে এই প্রক্রিয়ায় রদবদল করা হয়। জোনাল হেড প্রশান্ত কুমার সিংহ গত বছরের ৪ ডিসেম্বর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে একটি ‘সংশোধনী স্মারক’ জমা দিয়ে দাবি করেন, আমানতের কোডটি ভুলভাবে নথিভুক্ত হয়েছিল।
তার আগেই, গত বছরের ২৬ নভেম্বর ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আসা ওই আমানতটি এজেন্ট ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর (এজেন্ট হিসাব নম্বর: ৯৯৮২৯৯০০০০৩৩৫) দেখানো হয়। সাধারণত ব্রাঞ্চ ব্যাংকিংয়ের আমানতে কোনো এজেন্ট কমিশন পাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু চ্যানেল পরিবর্তন করে কাগজপত্রে এটিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সাফল্য হিসেবে দেখিয়ে সাদিকুর রহমান নামের এক এজেন্টকে আনুমানিক ২৫ লাখ ৭১ হাজার ২৪৩ টাকা ম্যানুয়ালি কমিশন হিসেবে প্রদান করা হয়।
ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে এজেন্টদের উৎসাহ দিতে একটি কমিশন নীতিমালা অনুমোদন করেছিল। কিন্তু সাধারণ আমানতকে এজেন্টের আমানত বানিয়ে এই নীতিমালার অপব্যবহার করা হয়েছে—এমন দাবি তুলে নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছেন এনআরবি ব্যাংকের সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে চলতি বছরের ২০ জুলাই এবং ৬ সেপ্টেম্বর দুই দফায় চিঠি পাঠিয়েছেন ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। চিঠি পাওয়ার পর বিষয়টি আমলে নিয়ে গত ২৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল সিলেট শাখায় অভিযান চালিয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ করে।
তদন্তের স্বার্থে সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা পাঁচটি নির্দিষ্ট বিষয়ে নজর দেওয়ার অনুরোধ করেছেন: ১. আমানতটি প্রকৃতপক্ষে কোন চ্যানেলে সংগৃহীত হয়েছিল? ২. ব্রাঞ্চ সিবিএস থেকে কেন তা এজেন্ট সিবিএসে স্থানান্তর করা হলো? ৩. ভুল কোড সংশোধনের নামে এমডির কাছে স্মারক দেওয়ার কারণ কী? ৪. কমিশনের মূল অর্থ কি আসলেই এজেন্ট পেয়েছেন, নাকি তা অন্য কারও কাছে গেছে? ৫. পর্ষদের নীতিমালার উদ্দেশ্য এখানে ব্যাহত করা হয়েছে কি না?
ইতোমধ্যে বিএডিসির অ্যাকাউন্ট নথি, ট্রানজ্যাকশন ট্রেইল, সিবিএস অডিট লগ, ভাউচার ও ই-মেইল চালাচালির নথি ফরেনসিক পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে।
এনআরবি ব্যাংকে আমানতের কমিশন নিয়ে বিশৃঙ্খলার অভিযোগ এটাই প্রথম নয়। এর আগে জালালাবাদ গ্যাসের আমানত সংগ্রহের স্বীকৃতি না পাওয়া ও কমিশন বঞ্চিত হওয়ার বিষয়ে ব্যাংকের সাবেক এক নারী কর্মী ও তাঁর বাবা জোনাল হেড প্রশান্ত কুমার সিংহের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রশান্ত কুমার সিংহ ও জুনায়েদ আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। জানা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্ত দল ব্যাংকে অভিযানের পরপরই প্রশান্ত কুমার সিংহ ভারতে চলে যান। সম্প্রতি নিয়মিত অবসরের বয়সে পৌঁছালেও তাকে পুনরায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে, শীর্ষ এক পরিচালকের সাথে সখ্য থাকার কারণে এতদিন তাঁর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যাংক কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিলেটের নির্বাহী পরিচালক খালেদ আহমেদ এ প্রসঙ্গে জানান, বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল কার্যালয় থেকে তদারকি করা হচ্ছে।